দক্ষিণ-পূর্ব আফ্রিকার দেশ মোজাম্বিক।

মোজাম্বিক পূর্বে ভারত মহাসাগর, উত্তরে তানজানিয়া, উত্তর-পশ্চিমে মালাউই ও জাম্বিয়া, পশ্চিমে জিম্বাবুয়ে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে সুইজারল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকা।

দেশটিতে ৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে পর্তুগিজ শাসন। স্বাধীনতা অর্জন করে ১৯৭৫ সালে। এর দুই বছরের মধ্যেই রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে দেশটি। ১৯৭৭ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত চলে এ লড়াই। ১৯৯৪ সালে প্রথম বহু দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হয়।
বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর অন্যতম মোজাম্বিক। যদিও দেশটি প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। অর্থনীতি মূলত কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তবে ক্রমবর্ধমান শিল্পের ওপরও অনেকাংশে নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। শিল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে খাদ্য ও পানীয়, রাসায়নিক নির্মাণ, অ্যালুমিনিয়াম ও পেট্রোলিয়াম পণ্য। দেশটির পর্যটন খাতও ক্রমবর্ধমান।
দক্ষিণ আফ্রিকা দেশটির প্রধান বাণিজ্য অংশীদার। এ ছাড়া বেলজিয়াম, ব্রাজিল, পর্তুগাল ও স্পেনেরও বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে মোজাম্বিকের সঙ্গে। ২০০১ সাল পর্যন্ত মোজাম্বিক বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধমান জিডিপির দেশগুলোর অন্যতম ছিল। তবে বর্তমানে আর সে পরিস্থিতি নেই। দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থা নাজুক।
নাগরিকদের গড় আয়ু অত্যন্ত কম। এইডসের কারণে মৃত্যুর হার অত্যন্ত বেশি। একই সঙ্গে শিশু মৃত্যুর হারও কম নয়।

মোজাম্বিকে বাংলাদেশিদের আগমন সম্পর্কে জানা যায়, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ পাকিস্তান যুদ্ধের পর পাকিস্তানে অবস্থানরত  দুজন বাংলাদেশী এক পাকিস্তানির মাধ্যমে মোজাম্বিকে ট্যুরিস্ট ভিসায় আসে। তাদের মধ্যে একজন  ছিলেন চট্রগ্রাম জেলার বাঁশখালী উপজেলার অন্যজন ছিলেন সাতকানিয়া উপজেলার। তারা মোজাম্বিকে আসার পর দেখে মোজাম্বিক খুবই গরিব দেশ। কোথাও চাকরি করার মত কোন সুযোগ নেই। কারণ মোজাম্বিকে তেমন কোন শিল্প কারখানা নেই। তাই তারা বিকল্প কর্ম হিসাবে ছোট খাটো ব্যবসা শুরু করে। সেই সাথে তারা তাদের ব্যবসা বাড়াতে শুরু করে। যখন তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বাড়তে থাকে তখন তাদের পরিবারের সদস্য এবং আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে আসে। তারপর থেকেই বাংলাদেশিদের  মোজাম্বিকে আগমন শুরু।

মোজাম্বিক সরকারের সাথে বাংলাদেশ সরকারের কোন সম্পর্ক না থাকলেও এই দেশে অনেক বাংলাদেশী অবৈধ পথে পাড়ি জমাচ্ছে। মোজাম্বিকে যারা পাড়ি জমাচ্ছে তারা দালালের মাধ্যমে ৬/৭ লাখ টাকা খরচ করে ট্যুরিস্ট ভিসায় আসছে। ২০১০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত অধিক সংখ্যক বাংলাদেশি মোজাম্বিকে এসেছে। ২০১৭ সালের পর থেকে মোজাম্বিক সরকার রেসিডেন্সের অনুমতি না দেওয়ায় বর্তমানে বাংলাদেশিদের মোজাম্বিক আসা কমে গেছে।


মোজাম্বিক একটি গরিব দেশ এখানে শিল্প কারখানা বলতে তেমন বেশি কিছু নেই যে বিদেশিরা এসে চাকরি পাবে। যে শিল্প কারখানা আছে সেখানে এই দেশের লোক অল্প বেতনে চাকরি করে। যার কারণে মোজাম্বিকে বাংলাদেশিদের শিল্প কারখানা বা কোন কোম্পানিতে চাকরির করার সুযোগ নেই। তাই বাংলাদেশিরা মোজাম্বিকে ব্যবসা কে কর্ম হিসাবে বেছে নিয়েছে। বেশির ভাগ বাংলাদেশি  ছোট বড় ব্যবসার সাথে জড়িত। এই দেশে সাধারণত দুই ধরনের ব্যবসা করে। প্রথমত মিনি সুপারশপ দ্বিতীয়ত কৃষি পন্যের । এই দেশে বর্ষার সময় বিভিন্ন কৃষি পন্যের প্রচুর চাষ করা হয় । তার মধ্যে  ভুট্টা, ডাল, চিনা বাদাম, তৈল,কাজু বাদাম ইত্যাদি। এই সব কৃষি পন্য বাংলাদেশিরা ক্রয় করে ভারতীয় বা চায়নার কোম্পানির  কাছে বিক্রি করে। ভুট্টা এই দেশের প্রধান খাদ্য। ভুট্টা ছাড়া সব কৃষি পন্য ভারতীয় কোম্পানি বা চায়না কোম্পানি বাজারজাতকরণ করে। মোজাম্বিকে প্রতিটি বড় বড় শহর থেকে শুরু করে গ্রামগঞ্জে বাংলাদেশিরা ব্যবসা করে।

মোজাম্বিকে সুনামের সাথে ব্যবসা করে যাচ্ছে বাংলাদেশিরা। তবে বাংলাদেশের সরকারি ভাবে কোন সুসম্পর্ক না থাকায় মাঝে মধ্যেই প্রশাসনিক ভাবে হয়রানি হতে হয় প্রবাসীদের। বাংলাদেশি প্রবাসীরা জানায়, যদি মোজাম্বিকে বাংলাদেশের দূতাবাস থাকতো তাহলে মোজাম্বিকে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা আরো বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা পেতো। এদেশের সব প্রবাসীদের একটাই আবেদন মোজাম্বিকে বাংলাদেশ দূতাবাস প্রতিষ্ঠা করা হোক। কারণ মোজাম্বিকে বাংলাদেশ দূতাবাস না থাকার কারণে মোজাম্বিক সরকার বাংলাদেশিদের মূল্যায়ন করে না। কোন ধরণের সমস্যা হলে কোন সমাধান পাওয়া যায় না। মোজাম্বিকে কোন বাংলাদেশি মারা গেলে সহজে দেশে পাঠানো যায় না। ডেট সার্টিফিকেটের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশ দূতাবাসে আবেদন করতে হয় যা অনেক সময় সহজে পাওয়া যায় না  পেলেও হয়রানির সম্মুখীন হতে হয়।  পাসপোর্ট হারিয়ে গেলে বা পাসপোর্ট মেয়াদ উর্ত্তীন হলে মোজাম্বিকে সমাধান করা যায় না ফলে অনেক টাকা জরিমানা গুনতে হয়। আর সেই পাসপোর্ট দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশ দূতাবাসে করতে দিলে অনেক ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। তাই মোজাম্বিকে অবস্থানরত সব বাংলাদেশিদের একমাত্র আবেদন মোজাম্বিকে বাংলাদেশের দূতাবাস স্থাপন করা হোক।

মোজাম্বিক বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য সম্ভবনাময় দেশ। সরকার যদি মোজাম্বিক সরকরের সাথে চুক্তিবদ্ধ করে তাহলে মোজাম্বিকে অনেক বাংলাদেশিদের কর্ম সংস্থান সৃষ্টির সম্ভবনা আছে। মোজাম্বিকে প্রায় ১৪ হতে ১৫ হাজার বাংলাদেশি প্রবাসী আছে তার মধ্যে বেশির ভাগ বাংলাদেশি ব্যবসার সাথে জড়িত। কিছু বাংলাদেশি যাদের মূলধন নেই তারা অন্য বাংলাদেশির ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। যে ১৪/১৫ হাজার বাংলাদেশি প্রবাসী মোজাম্বিকে আছে তাদের মধ্যে শতকরা ৯০% চট্রগ্রাম জেলার বাঁশখালী উপজেলার।